মুহাম্মদ আবদুল্লাহ আল মাসুম
বিশ্ব নন্দিত গবেষক ও দার্শনিক আ’লা হযরত ইমাম আহমদ রেযা খান (রাহমাতুল্লাহি আলাইহি) সমসাময়িক বিজ্ঞ শিক্ষকগণ কিংবা আপন প্রকৃতিগত প্রতিভার মাধ্যমে প্রায় ৫৫ টি বিষয়ের বিদ্যায় পারদর্শিতা লাভ করেছিলেন- যার একটি তালিকা তৈরী করে তিনি নিজেই ১৩২৪ হিজরীতে মক্কা শরীফের মুফতী আল্লামা খলিল মক্কী রহমাতুল্লাহি আলাইহির নিকট পেশ করেছিলেন এবং এগুলোর এযাযত নামাও লাভ করেছিলেন। তাঁর এই জ্ঞানগর্ভ চিন্তাধারা ও ক্ষুরধার লিখনি দেখে আধুনিক দার্শনিকরা তাঁকে জ্ঞান-বিজ্ঞানের ‘‘এনসাইক্লোপিডিয়া’’ তথা বিশ্বকোষ বলে অভিহিত করেছেন। কেননা, তাঁর কলমের এমন শান ছিল যে, তিনি কম বেশি পঞ্চাশটি বিষয়ের উপর অসংখ্য কিতাব রচনা করেছেন এবং জ্ঞান-বিজ্ঞানের এমন প্রস্রবণ জারী করেছেন যার থেকে আজও বিশ্ববাসী তৃপ্তির সাথে উপকার গ্রহণ করছে। পক্ষ-বিপক্ষের সকলেই একবাক্যে স্বীকার করে নিতে বাধ্য হয়েছে যে, হুযূর ইমাম আহমদ রেযা খাঁন রহমাতুল্লাহি আলাইহি ছিলেন যুগশ্রেষ্ঠ কলম সম্রাট। যে বিষয়ের উপর তিনি কলম ধরেছেন দ্বিতীয় কারোও কলম ধরার সাহস হয়নি। তিনি তাঁর সুচিন্তিত মতামত, জ্ঞানগর্ভ চিন্তাধারা ও ক্ষুরধার লিখনির মাধ্যমে ভারত উপমহাদেশে ইসলামী জ্ঞান-বিজ্ঞানের অঙ্গনে এক নব জাগরণ সৃষ্টি করেছেন। যার জীবন্ত প্রমাণ বহন করছে তাঁর রচিত সহস্রাধিক গ্রন্থ-পুস্তক। তিনি শুধুমাত্র গবেষণা, ফতোয়া ও পুস্তকাদি রচনায় আত্মনিয়োগ করেননি; বরং সমকালীন বিশ্বের ঘটনা প্রবাহ ও চলমান রাজনৈতিক, সমাজিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় বিভিন্ন বিষয়ে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করতেন।
উপমহাদেশে যখন ইংরেজ শাসকদের লেজুড়বৃত্তি করে কিছু লিখক নিজেদের লেখায় মুসলমানদের হৃদয় থেকে নবীর ভালোবাসা, সাহাবাদের মহত্ত¡, আহলে বায়ত তথা নবী পরিবারের প্রতি ভালোবাসা, ও বুজুর্গ আওলিয়ায়ে কেরামগণের অবদানের স্মৃতি গুলো নিভিয়ে দিয়ে তাদের ভ্রান্ত মতবাদকে প্রতিষ্ঠা করার অপচেষ্টা করছিল তখনই ইমাম আলা হযরত রহমাতুল্লাহি আলাইহি কলম ধরলেন পবিত্র কুরআনুল করিমের সঠিক তরজুমা (অনুবাদ) কর্মে। ১৩৩০ হিজরিতে শুরু করে মাত্র কয়েক মাসের মধ্যে মুসলিম মিল্লাতকে উপহার দিলেন কুরআনে কারীমের অসাধারণ অনুবাদ গ্রন্থ “তরজুমায়ে কানযুল ঈমান”। তিনি শরীয়তের গন্ডির মধ্যে থেকে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি ভক্তি, শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও অনুরাগ দেখিয়ে অতুলনীয় ভাষা শৈলী ও ছন্দের যাদু প্রদর্শন করে নাত-কাব্য রচনা করে সাহিত্য জগতেও অবদান রেখেছেন । তিনি উর্দু, আরবী এবং ফারসি প্রভৃতি ভাষায় হামদ-নাত শরীফ লিখেন। তিনি এই নাতের দেওয়ানাতে আরবী অলংকার শাস্ত্রের ফাসাহাত ও বালাগাতের সমাহার করেছেন। তার প্রতিটি নাত-কাব্যে প্রকাশ পেয়েছে নবী প্রেমের অসাধারণ প্রকাশভঙ্গী। এই কাব্যগ্রন্থের নাম “হাদায়েকে বখশীশ”।
তাঁর রচনাবলীর মধ্যে বিশ্বব্যাপী বিজ্ঞ গবেষক ও সুধী মহলে সাড়া জাগানো অনন্য হলো- ‘‘ আল আতায়া আন নবভীয়্যাহ ফিল ফতওয়া আর রজভীয়্যাহ ’’ সংক্ষেপে যাকে ফতওয়ায়ে রেজভীয়্যাহ বলা হয়। লক্ষাধিক বিষয়ের সমাধানে বিশাল সম্ভার মুসলিম জাতিকে উপহার দিয়েছেন। বর্তমানে প্রায় ৩০ খন্ডে এটি প্রকাশিত হয়েছে। বিশেষত উর্দু ভাষায় প্রায় ২২০০০ পৃষ্ঠা সম্বলিত, ছয় হাজার আটশত সাত চল্লিশটি প্রশ্নোত্তর এবং ২০৬ টি পুস্তিকা সম্বলিত। এই গ্রন্থটি ফিকহ শাস্ত্রে শুধুমাত্র হানাফি মাযহাবের মহান কীর্তিই নয়, বরং ইলমে ফিকহের ইতিহাসেও এক অনবদ্য কর্ম। বিশ্ব বিখ্যাত ইসলামী চিন্তাবিদ ড. আল্লামা ইকবাল রহমাতুল্লাহি আলাইহি ফিক্হ শাস্ত্রে ইমাম আহমদ রেজা খান রহমাতুল্লাহি আলাইহির সুক্ষ গবেষণা ও গভীর দৃষ্টিপাতের স্বীকৃতি দিয়ে বলেন- ‘‘ভারত বর্ষে হযরত আহমদ রেজার মত সুস্থ স্বভাব ও মেধাসম্পন্ন ফকীহ আর জন্ম হয়নি। এটি ( ফতওয়ায়ে রেজভীয়্যাহ) তার মেধা, তীক্ষ্ম বুদ্ধি, উন্নত স্বভাব, অনুধাবন ক্ষমতা ও দ্বীনি জ্ঞানের গভীরতার জ্বলন্ত সাক্ষী। তাই তার পক্ষে সম্ভব হয়েছে আমেরিকার জ্যোতিষীর বিশ্বব্যাপি আতংক ছড়ানো সেই ‘কিয়ামতের পূর্বাভাস’ এর যৌক্তিক খন্ডন ও বৈজ্ঞানিকভাবে ভুল প্রমাণিত করা। তিনি আইনস্টাইন এবং নিউটনের দৃষ্টিভঙ্গির সমালোচনা করে ৩টি বিজ্ঞান বিষয়ক বই যথা-১.আল কালিমাতুল মূলহামাতু ফীল হিকমাতিল মুহকামা লি ওয়ায়ে ফালসাফাতিল মুশামমাহ (১৯১৯ খ্রিঃ) ২. ফাওযে মুবীন দর রদ্দে হরকতে যমীন(১৯১৯ খ্রিঃ) ৩. নযুলে আয়াতে কুরআন বে সাকুনে যমীন ওয়া আসমান (১৯১৯ খ্রিঃ) রচনা করে জ্যোতির্বিজ্ঞানের অঙ্গনে আলোড়ন সৃষ্টি করেন। কেননা, তিনি উক্ত বই সমুহে নিউটন, আইনস্টাইন ও আলবার্ট এফ পোর্ট প্রমুখের প্রচারিত অভিমত খন্ডন করে কুরআনুল করিমের আয়াত দ্বারা প্রমাণ করেছেন যে, পৃথিবী স্থির, সূর্য এবং অন্যান্য গ্রহ-নক্ষত্র পৃথিবীর চারিদিকে নিজ নিজ কক্ষপথে পরিভ্রমণে করছে। এ মতের স্বপক্ষে তিনি ১০৫টি প্রমাণ দাঁড় করেন- যার মধ্যে ১৫টি প্রমাণ পূর্বকার লেখকদের গ্রন্থ থেকে আর ৯০টি দলীল স্বয়ং তিনি নিজেই দাঁড় করেন।
গণিত শাস্ত্রে তিনি অসাধারণ প্রতিভার অধিকারী ছিলেন। কথিত আছে যে, তিনি আলিগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর ডক্টর জিয়া উদ্দিনের (যিনি গণিত শাস্ত্রে বিদেশী ডিগ্রি ও স্বর্ণ পদক লাভ করেছিলেন) একটি গাণিতিক সমস্যার সমাধান করে দিয়েছেন- অথচ এর সমাধানের জন্য তিনি জার্মান সফরের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। গণিতশাস্ত্রে তাঁর পান্ডিত্যের কথা জানতে পেরে স্যার জিয়াউদ্দিন কোন । ঐ গাণিতিক সমস্যার সমাধানের জন্য আ’লা হযরত রহমাতুল্লাহি আলাইহির দরবারে গমন করেন। আ’লা হযরত রহমাতুল্লাহি আলাইহি ভাইস চ্যান্সেলর সাহেবের প্রশ্নটা শুনা মাত্রই তার সন্তোষ জনক উত্তর দিয়ে দিলেন। তাঁর উত্তর শুনে স্যার ড. জিয়াউদ্দিন কিছুক্ষণ অবাক হয়ে রইলেন। তারপর তাঁকে বললেন: “হযরত! আমি এ প্রশ্নের সমাধানের জন্য জার্মান যেতে ইচ্ছা করেছিলাম, কিন্তু আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের ধর্ম বিভাগের অধ্যাপক মাওলানা সৈয়্যদ সুলায়মান আশরাফ সাহেব আমাকে সমস্যাটার সমাধানের জন্য প্রথমে আপনার নিকট আসতে বলায় আমি এখানে আসলাম। আপনার উত্তর শুনে মনে হচ্ছে, আপনি সমস্যাটার সমাধান যেন বইতে নিজ চোখে দেখতে পাচ্ছেন।” তাঁর জ্ঞানের গভীরতা ও ব্যক্তিত্বে তিনি এতই মুগ্ধ হয়েছিলেন যে, মুখে দাড়ি রেখে দিলেন এবং নামায রোযা নিয়মিত আদায় করার সৌভাগ্য অর্জন করলেন। (হায়াতে আ’লা হযরত, ১ম খন্ড, ২২৩, ২২৯ পৃষ্ঠা, মাকতাবাতুল মদীনা, বাবুল মদীনা, করাচী)
ইমাম আলা হযরত রহমাতুল্লাহি আলাইহি তাঁর সময়ে সৃষ্ট বিভিন্ন ফিতনা-ফির্কা, মতবাদ ও বিভ্রান্তির যথাযথ জবাব প্রদানে সদা তৎপর ছিলেন। ১৯০১ সালে যখন মির্জা গোলাম আহমদ কাদিয়ানী (১৮৩৯-১৯০৮ ইং) নিজেকে নবী দাবী করলো, তখন তিনি তার এই ভ্রান্ত মতবাদ খন্ডনে স্বতন্ত্র পাঁচটি পুস্তক যথা-১.জাযাল্লাহু আদুওয়াহু বিআবায়ে খতমিন নবুয়ত ২.আস সূউ ওয়াল ইক্বাবু আলাল মাসীহিল কায্যাব ৩. ক্বহরুদ্দিয়ান আলা মুরতাদি বিকাদীয়ান ৪. আল মুবিনু খতমুন নবিয়্যিন ৫. আল জারাযুদ্দিয়ান আলাল মুরতাদিল কাদীয়ানী রচনা করেন ভন্ড নবীর মুখোশ বিশ্বের সামনে উন্মোচন করে দিয়েছেন।
অনুরুপভাবে শিয়া সম্প্রদায়ের একটি গ্রুপ যখন আল্লাহ্ তায়ালা, তাঁর হাবীব সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম, পবিত্র ক্বোরআন ও সাহাবায়ে কেরাম রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুমকে নিয়ে ঈমান বিধ্বংসী নানা মন্তব্য করতে লাগল তখন তাদের দাঁতভাঙ্গা জবাব দিয়ে আলা হযরত রাহমাতুল্লাহি আলায়হি লিখলেন-১. আল আদিল্লাতুত্বাঈনা ফি আযানিল মুলাঈনা ২. মাত্বলাউল কামরাইন ফি আবানাতি সাবক্বাতিল ওমারাইন ৩. গায়াতুত তাহকীক ফি ইমামতি আলী ওয়াস সিদ্দিক ৪.রদ্দুর রাফেযী সহ প্রায় ২০টির অধিক কিতাব।
যখন তাসাউফের নামে কিছু সংখ্যক লোক শরিয়ত নির্দেশিত কর্মকন্ডকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে এবং দাবী করে নামায, রোযা, হজ্জ, যাকাত প্রভৃতি আনুষ্ঠানিকতা মাত্র। ইসলামের মূল হল একমাত্র তরিকত। তাদের বিভ্রান্তির স্বরূপ উম্মোচন করে ইমাম আহমদ রেযা খান রহমাতুল্লাহি আলাইহি লিখেন-১.কাশফু হাকায়িক ওয়া আসরারে দাকায়েক, ২.আল ইয়াকূতাতুল ওয়াসেত্বাতু ফি কলবি আকদির রাবিত্বাহ, ৩.নুক্বাউস সালাকাহ ফি আহকামিল বাইআতি ওয়াল খিলাফাহ, ৪.মক্বালুল উরাফায়ি বিঈযাযি শরয়ীও ও ওলামায়ি নামক পুস্তকাদি। যা তাসাউফ’র প্রকৃত পরিচিতি তুলে ধরার পাশাপাশি তাসাউফের নামে ভন্ডামীর খোলস খুলে দেয়।
যখন খ্রিস্টান মিশনারী সংস্কৃতির নামে বেহায়াপনা ও অশ্লীলতা প্রচার করে মুসলিম যুব সমাজকে ঈমান ও পবিত্র আদর্শ থেকে বিচ্যুৎ করার অপচেষ্টা চালায় তখন তাদের মুখোশ উন্মোচন করে লিখলেন-“সাইফুল মুস্তফা আলা আদয়ানীল ইফতিরায়ি”। এভাবে তিনি তাঁর কলমের জিহাদ অব্যাহত রেখে সকল অপশক্তির বাতুলতার দাঁতভাঙ্গা জবাব দিয়ছেন। যে সমস্ত সংস্থা, সংগঠন ও ব্যক্তি ইসলামী লেবাস পরিধান করে ইংরেজদের কৃপা ও অনুগ্রহ পাবার আশায় ইসলামকে বিকৃত করার অপচেষ্টায় লিপ্ত তাদের সেই ঘৃণ্য অপকর্মের স্বরূপ উম্মোচন করে দিয়ে তিনি বিশ্ব মুসলিম জাতিকে তাদের সম্পর্কে সতর্ক করে দিতে সদা সচেষ্ট ছিলেন।
বর্তমান সংঘাতময় বিশ্বকে সন্ত্রাসবাদ, জঙ্গীবাদ ও নাস্তিক্যবাদী ও ইসলাম বিরোধী তৎপরতা থেকে রক্ষা করতে হলে আলা হযরতের কোরআন সুন্নাহর বিজ্ঞান ভিত্তিক দর্শন আলোকে জীবন পরিচালনা করতে হবে। অন্যতায় পশ্চিমা শক্তি মোনাফেক মুসলমানদের অর্থ দিয়ে ভাড়া করে প্রকৃত ইসলামের ক্ষতি সাধন করতে সক্ষম হবে।
লিখক: আরবী প্রভাষক, রাণীরহাট আল-আমিন হামেদিয়া ফাযিল মাদ্রাসা।
খতিব, রাজানগর রাণীরহাট ডিগ্রি কলেজ মসজিদ, রাঙ্গুনিয়া, চট্টগ্রাম।